চীনের মহাপ্রাচীর

“Untill you reach the Great Wall, you’re no hero.” -Chairman Mao

পৃথিবীর আশ্চর্যতম স্থাপত্যগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি চীনের মহাপ্রাচীর। এটি বিশ্বের যে কোনো দেশের প্রতিরক্ষা প্রকল্পের অধীনে নির্মিত সর্ববৃহৎ প্রাচীর। ১৯৮৭ সালে একে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। পাহাড়, পর্বত, মরুভূমি, উপত্যকা এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মধ্য দিয়ে পূর্ব থেকে পশ্চিমে বিস্তৃত এই মহাপ্রাচীরের দৈর্ঘ্য ৮৮৫২ কিলোমিটার (৫৫০০ মাইল) যার মধ্যে ৫৫০ কিলোমিটার পড়েছে বেইজিংয়ের মধ্যে।
The Great Wall of China, Ref. Wikimedia
নিরাপত্তা ও আত্মরক্ষার জন্য প্রাচীর নির্মাণ পদ্ধতি অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। অগণিত মানুষের জীবন, রক্ত, ঘাম এবং অশ্রুর বিনিময়ে সৃষ্ট বিশ্বের দীর্ঘ এই প্রাচীরের নির্মাণ শুরু হয়েছিল খ্রীষ্টপূর্ব ৭০০ অব্দে। চীন তখন অনেকগুলো খন্ড খন্ড রাজ্যে বিভক্ত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ২২১ অব্দে ছিন রাজবংশের প্রথম রাজা শি হুয়াং তি চীনের ছয়টি রাজ্য (হান, চাও, ওয়েই, ছু, ইয়ান এবং ছি) জয় করে একক শাসন ব্যবস্থার অধীনে আনেন। এই সময় উত্তরাঞ্চলের শাসকদের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য, তিনি রাজ্যের উত্তর সীমান্ত বরাবর পার্বত্য এলাকায় এই মহাপ্রাচীর তৈরির উদ্যোগ নেন।

এই প্রাচীর সারির নির্মাণ, পূণঃনির্মাণ, সম্প্রসারন ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি প্রজন্মে ভাগ হয়ে ষোড়শ শতক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। রাজ্যগুলির মধ্যে কিন রাজ্য অন্যান্য রাজ্যের চেয়ে শক্তিশালী ছিল। কিনের রাজা কিন ষি হুয়াং অন্যান্য রাজাদের সংঘবদ্ধ করে নিজে চীনের প্রথম সম্রাট হন। চীনের উত্তরে দুর্ধষ তাতারদের (মোঙ্গল) হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য সম্রাটের আদেশে ২২০-২০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে প্রাচীর তৈরির কাজ আরম্ভ হয়। ঐতিহাসিকদের মতে দীর্ঘ প্রাচীর নির্মাণ করতে রোগ, দুর্ঘটনা,, অনাহার ও কঠিন পরিশ্রমের কারণে কয়েক লক্ষ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছিল। কিন বংশের শাসনামলে নির্মিত এই প্রাচীরের বেশিরভাগই কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। এরপরেত্ত হান, সুই, নরদার্ন এবং জিং রাজবংশের শাসনামলে চীনের উত্তরে মোঙ্গলদের আগ্রাসন থেকে বাঁচার জন্য চীনের প্রাচীরের পরিবর্ধন, সম্প্রসারন এবং পূণঃনির্মাণ হয়েছে।

চীনের বর্তমান মহাপ্রাচীরের মূলভিত্তি রচিত হয়েছিল মিং রাজবংশের আমলে (১৩৬৮ – ১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে)। ১৫৫০ সালে তুমুর যুদ্ধে মঙ্গোলিয়ানরা সম্রাটের সেনাবাহিনীকে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে দীর্ঘ এক মাস ধংসযঙ্গ ও লুঠতরাজ চালিয়ে ফিরে যায়। এরপর সম্রাটের নতুন সেনাবাহিনী প্রধান ছি চি গুয়াং-এর উদ্যোগে নতুনভাবে প্রাচীর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। এবার ২০ থেকে ৩০ ফুট উঁচু ও ১৫ থেকে ২০ ফুট প্রশস্ত প্রাচীর তৈরিতে মাটির পরিবর্তে ইট ও পাথর ব্যবহার করা হয় এবং কিছুদুর পর পর পর্যবেক্ষণ টাওয়ার রাখা হয়। এটি ছিল দীর্ঘকাল ব্যাপী সম্রাটের মহাপরিকল্পনা, যার জন্য রাষ্ট্রের ৭৫% আয়ের অর্থ খরচ করতে হয়েছিল।

সেসময় চীনের উত্তর-পূর্ব অংশে মাঞ্চুরিয়া নামে আরেকটি সাম্রাজ্য ছিল। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে মিং রাজবংশ দুর্বল হয়ে পড়ে। মাঞ্চুরিয়রা ১৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রাচীর ভেঙে বেইজিং অবরোধ করলে মিং রাজবংশের পতন ঘটে এবং সেই সঙ্গে সমগ্র চীনে মাঞ্চুরিয়ান কিইং রাজবংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এদের রাজ্য মহাপ্রাচীরের দুই পাশেই বিস্তৃত ছিল। অর্থাৎ মঙ্গোলিয়ার বেশিরভাগ অংশও এদের আওতায় এসেছিল। তাই প্রতিরক্ষা হিসাবে প্রাচীরের আরো কোন গুরুত্ব রইল না এবং সেইসাথে মহাপ্রাচীরের নির্মান, পূণঃনির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষনও বন্ধ হয়ে যায়।। উল্লেখ্য, কিইং ছিল চীনের শেষ রাজবংশ।
Map of the great wall in China,  Ref. Internet
বিশ্বে মানুষের তৈরি সবচেয়ে বড় স্থাপত্য চীনের মহাপ্রাচীর দীর্ঘদিন ধরে অরক্ষিত ও সংস্কারহীনভাবে পড়েছিল। অনেক জায়গায় প্রাচীরের ইট-পাথর স্থানীয় লোকজন নিয়ে গেছে কিংবা স্থানীয় জনসাধারণ দখল করে নিজেদের কাজে ব্যবহার করছে, আবার কোথাও ঝড়-বৃষ্টি-প্লাবনের আঘাতে সম্পুর্ণ তলিয়ে গেছে। এটি এখনও দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে খুবই আকর্ষনীয়, তাই সাম্প্রতিককালে পর্যটকদের সুবিধার্থে কিছু কি্ছু অংশ সংস্কার করে যাতায়াতের জন্য বিশেষভাবে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। বেইজিং থেকে উত্তর-পশ্চিমে ৭০ কিলোমিটার দূরে মহাপ্রাচীরের চীনা-বাদানিং অংশটি পর্যটকদের কাছে বেশি আকর্ষণীয়।

চাঁদ থেকে দেখা যাওয়া পৃথিবীর একমাত্র স্থাপনা চীনের মহাপ্রাচীর। হাজার বছর ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষের কঠোর পরিশ্রমে নির্মিত চীনের মহাপ্রাচীরের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক মানুষের আনন্দ-দুঃখ-বেদনার ইতিহাস। এটি দেখে অনেকেই অভিভুত হন, অনেকের মনে অনেক প্রশ্ন জাগে। সব প্রশ্নের উত্তর ইতিহাসে পাওয়া যায় না। চীনের মহাপ্রাচীর এখন শুধু দুই দেশ বা দুই জাতির মাঝখানের সর্বোচ্চ প্রতিবন্ধকতাই নয়, এটি এখন ভালো ও মন্দ এবং ভালোবাসা ও ঘৃণার মাঝখানের সর্বোচ্চ ফারাক বা প্রতিবন্ধকতা প্রকাশের প্রতিকী উদাহরণ হিসাবেও ব্যবহৃত হয়।

“No, there is not a thin line between love and hate. There is, in fact, a Great Wall of China with armed sentries posted every twenty feet between love and hate.” – Unknown

সূত্র: উইকিপিডিয়া ও এনসাইক্লোপিডিয়া অফ ব্রিটেনিকা

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।