ফিরে দেখা ২০২১

2021 at a glance

২০২১ সালজুড়ে করোনা মহামারি, করোনার ধরন ডেলটা-অমিক্রন, টিকা বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিল। এর বাইরেও বৈশ্বিক তাপমাত্রা, আফগানিস্তান পরিস্থিতি, মহাকাশ পর্যটনসহ কয়েকটি বিষয় নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ভবনে হামলা দিয়ে বছর শুরু হয়েছিল; শেষ হচ্ছে আবার ক্ষমতার কোনো সংঘাত নিয়ে। মাঝে আরও নানা অঘটন ঘটে গেছে। সেই সব ঘটনা প্রবাহের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা।

মার্কিন কংগ্রেস ভবনে হামলা

USAনির্বাচনে হেরে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। জো বাইডেনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ আনতে থাকেন। সমর্থকদের উসকানি দিচ্ছিলেন। এ থেকেই ঘটে যায় যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এক ন্যাক্কারজনক ঘটনা। গত ৬ জানুয়ারি দেশটির কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে হামলা চালান ট্রাম্পের উগ্র সমর্থকরা। রক্তাক্ত এ হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন। আহত হন শতাধিক। এ ঘটনাকে ‘মার্কিন গণতন্ত্রের ওপর নগ্ন হামলা’ হিসেবে মন্তব্য করেন রাজনীতিকরা।

মিয়ানমারে সেনা অভ্যুত্থান


গত ১ ফেব্রুয়ারি মিয়ানমারের শাসন ক্ষমতা দখল করে নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ভোট জালিয়াতির অভিযোগ এনে দেশটির নেত্রী অং সান সু চি, প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট এবং ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) শীর্ষ নেতাদের আটক করা হয়। জারি করা হয় জরুরি অবস্থা। এর প্রতিবাদে রাজপথে নামেন হাজার হাজার মানুষ। সেই বিক্ষোভ প্রতিহত করতে সহিংসতা বেছে নেয় দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী। এতে এ পর্যন্ত এক হাজার ৩০০ জনের বেশি নিহত হয়েছেন বলে অভিযোগ আছে। গ্রেপ্তার আছেন হাজারও মানুষ।

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন; মমতার জয়-পরাজয়


পশ্চিমবঙ্গে আট পর্বের ভোটগ্রহণ শেষে বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণা হয় গত ২ মে। গত ১০ বছর ধরে রাজ্যে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস আবারও পশ্চিমবঙ্গের দখল নেয়। কিন্তু নিজের আসনে হেরে যান দলপ্রধান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। হেরে গেলেও সংবিধান মেনে দল তাকে মুখ্যমন্ত্রী করে। জয়ের শর্ত কাঁধে নিয়ে ৫ মে টানা তৃতীয়বারের মতো মুখ্যমন্ত্রিত্ব নেন মমতা। বিষয়টি এমন ছিল, মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে হলে তাকে ছয় মাসের মধ্যে ওই আসনে জিততেই হবে। শেষপর্যন্ত গত ৩০ সেপ্টেম্বর উপ-নির্বাচন হয়। ফল ঘোষণা হয় ৩ অক্টোবর; বড় ব্যবধানে জয়ী হন মমতা। মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকতে আইনগত শর্তপূরণ হয় তার।

তালেবানের কাবুল দখল


গত অগস্টে তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় আফগানিস্তান। দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে মার্কিন সেনারা যখন দেশে ফিরবেন, ঠিক সেই সময়ে শুরু হয় রাজধানী কাবুল দখলের দামামা। একের পর এক প্রদেশ দখল করে কাবুল বেড় দিচ্ছিলেন তালেবান যোদ্ধারা। আতঙ্কিত জনপদে পরিণত হয় পুরো নগরী। ঠিক এই সময়ে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান তখনকার প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি। এ সুযোগে নতুন ইতিহাস রচনা করে তালেবান। কাবুলের পর সর্বশেষ পাঞ্জশির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সরকার গঠন করে গোষ্ঠীটি। তালেবানের এই ক্ষমতার পালাবদলে অসংখ্য মানুষের প্রাণ গেছে। দেশটিতে প্রায় প্রতিদিনই হামলা, গুলি, বোমা বিস্ফোরণ লেগে ছিল। বহু মানুষ আহত হন। বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার মানুষ। যারা রয়েছেন, তাদের অনেকে আবার অনাহারে ভুগছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য-সহযোগিতা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চরম অর্থনৈতিক সংকটে দেশটি। এরমধ্যে আবার তালেবানের নতুন নতুন নিয়ম।

করোনাভাইরাস, টিকাদান ও বিক্ষোভ


করোনাভাইরাস মহামারির শুরু আগের বছরে হলেও এবারও কোনো অংশে কম ছিল না। ভাইরাসটির নতুন নতুন ধরন নাস্তানাবুদ করে দিয়ে গেছে কোনো কোনো দেশকে। ডেল্টা ধরনের বিস্তারে মৃত্যুপুরী ছিল ভারত। আবার মহামারি মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতা, লকডাউন ও অর্থনৈতিক সংকটের জেরে বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ হয়েছে। এছাড়া ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে করোনার বিধিনিষেধের বিরুদ্ধেও বিক্ষোভ হয়। তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও আশার কথা হচ্ছে, এ বছরই ভাইরাসটির টিকা ব্যাপক হারে দেওয়া শুরু হয়। অনেক দেশ ইতোমধ্যে বুস্টার ডোজও দিচ্ছে।

ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত


ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে সংঘাত বহুদিনের। মাঝে কয়েক বছর বড় ধরনের কিছু হয়নি। কিন্তু এ বছরের মে মাসে হয়ে গেছে রক্তক্ষয়ী এক সংঘাত। ১১ দিনের এ যুদ্ধে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ২৫০ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। ইসরায়েলে নিহত হন ১২ জন।

এছাড়া ভারতে বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে বছরজুড়ে কৃষক আন্দোলন, জুলাইয়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় সাবেক প্রেসিডেন্ট জ্যাকব জুমাকে গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে বিক্ষোভ ও দাঙ্গা, অক্টোবরে সুদানে আবারও সেনা অভ্যুত্থান, জুলাইয়ে তিউনিসিয়ায় কভিড মোকাবিলায় ব্যর্থতার জেরে বিক্ষোভের মুখে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিচাম মেচিচিকে বরখাস্ত, জুলাইয়ে হাইতির প্রেসিডেন্টকে গুলি করে হত্যা, নভেম্বরে সুইডেনের ইতিহাসের প্রথমবারের মতো নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই পদত্যাগ, সেপ্টেম্বরে কানাডায় মধ্যবর্তী ফেডারেল নির্বাচন, ডিসেম্বরে হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে ভারতের প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধান জেনারেল বিপিন রাওয়াতের মৃত্যু, চীন-তাইওয়ান সংকট, হংকংয়ে বিক্ষোভ ; এমন আরও অনেক ঘটনায় সারাবছর উত্তাল ছিল বিশ্বরাজনীতি।


২০২১ সালে বাংলাদেশের জাতীয় অঙ্গনের আলোচিত ঘটনা

১। আর নয় এলডিসি


বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকায় ঢুকেছিল ১৯৭৫ সালে। এরপর ২০১৮ সালে এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রাথমিক সুপারিশ পায় বাংলাদেশ। আর চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি) এলডিসি থেকে উত্তরণের চূড়ান্ত সুপারিশ করে। এরপর গত ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বাংলাদেশ সম্পর্কে সিডিপির সুপারিশ গ্রহণ করে। এর ফলে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে পুরোপুরি বের হয়ে যাবে বাংলাদেশ।

২। আবদুল কাদের মির্জা


বছর যখন শুরু হয়, তখন চলছিল পৌরসভা নির্বাচন। সেই নির্বাচনের সহিংসতা বা অনিয়ম নিয়ে লেখালেখি হয়েছেও প্রচুর। আবার সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন ফেনীর কোম্পানীগঞ্জের বসুরহাট পৌরসভার মেয়র প্রার্থী আবদুল কাদের মির্জা। সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করা ছিল তাঁর প্রথম আলোচিত কর্মকাণ্ড। এরপর তিনি দল, দলের নেতা, নির্বাচনের অনিয়ম ও দুর্নীতিসহ নানা বিষয়ে ক্রমাগত কথা বলে গেছেন। আর বছর শেষে কেবল যে তাঁর মুখ চলেছে তা নয়, হাত-পাও সমানে চলেছে।

৩। ইভ্যালির পতন


ইভ্যালির পতনের সঙ্গে অন্য যেকোনো পতনের তুলনা করা কঠিন। কারণ, ইভ্যালি যে কেবল নিজে ডুবেছে তাই নয়, পুরো ই-কমার্স খাত নিয়ে ডুবেছে। আর সেই সঙ্গে লাখ লাখ গ্রাহকও হারিয়েছেন সব অর্থ। ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১: ঝড়ের গতিতে উত্থানের পর আকস্মিক পতন। গ্রাহক ঠকানোর একের পর এক অভিযোগের মুখে মামলার পর গ্রেপ্তার হলেন ই-কমার্স সাইট ইভ্যালির এমডি মোহাম্মদ রাসেল এবং তার স্ত্রী প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান শামীমা নাসরিন। এমনকি ইভ্যালির পতন থেকে রক্ষা পাননি তারকারাও। তাহসান খান, মিথিলা ও শবনম ফারিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন গ্রাহকেরা। আবার অর্থ আত্মসাতের ইভ্যালি মডেল ছড়িয়ে পড়েছিল ই কমার্স খাতে।

৪। নারী ফুটবল ও ক্রিকেট


২০২১ সালের আলোচিত হতাশার নাম যদি হয় ছেলেদের ক্রিকেট ও ফুটবল, তাহলে আলোচিত সাফল্যের নাম মেয়েদের ফুটবল ও ক্রিকেট। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ক্রিকেটের ভরাডুবি হয়েছে। অন্যদিকে ছেলেদের ফুটবল নিয়ে আলোচনা যত কম করা যায়, ততই ভালো। অন্যদিকে এবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ ক্রিকেট ফেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে নারী ক্রিকেট দল। তবে বছর শেষে উদ্বেলিত করেছে অনূর্ধ্ব-১৯ নারী ফুটবল দল। ভারতকে হারিয়ে তারা অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ।

৫। গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীর


গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র ও গাজীপুর নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলমকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় গত ১৯ নভেম্বর। মূলত গোপনে ধারণ করা তাঁর কথোপকথনের একটি ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও জেলার কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা সম্পর্কে বিতর্কিত মন্তব্য করা হয়েছে বলে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অভিযোগ করেন। বিষয়টি নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনার পরে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় দলটি। এরপর মেয়রের পদ থেকেও তাঁকে বরখাস্ত করা হয়।
এর আগে গত জুনে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে টাঙ্গাইলের প্যানেল মেয়র হাফিজুর রহমানকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল স্থাপন নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলীকে মেয়র পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয় এই ডিসেম্বরেই। আবার এ মাসেই শিক্ষা কর্মকর্তাকে লাঞ্ছিত করায় জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ পৌরসভার মেয়র শাহনেওয়াজ শাহানশাহকে উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্যপদ থেকে বহিষ্কার করা হয়।

৬। মুরাদ হাসানের বিমানবন্দর সফর


সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রীকে বিদায়ী বছরে অনেকগুলো কারণে আলোচিত চরিত্রের তালিকায় রাখা যায়। মন্ত্রী হয়েও প্রকাশ অযোগ্য যেসব কথাবার্তা প্রকাশ্যে বলেছেন, তা বিস্ময়কর। একই বিস্ময় প্রকাশ করা যায় তার ফাঁস হওয়া ফোনালাপ শুনলেও। এরপর মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগে বাধ্য হন তিনি। ঘটনা এখানেই শেষ ছিল না। পদত্যাগ করে এরপর মুরাদ হাসান রওনা দেন কানাডায়। সেই ভ্রমণটাই আসলে সবচেয়ে বেশি চমকপ্রদ। কানাডা সরকার ঢুকতে না দেওয়ায় সেখানকার বিমানবন্দর থাকতে হয়। সেখান থেকে চলে থেকে যান দুবাইতে। সেখানেও রাত কাটাতে হয় বিমানবন্দরেই। ফলে দেশে ফিরে আসা ছাড়া আর উপায় ছিল না। তবে ঢাকা ফিরে তাঁকে বিমানবন্দর ত্যাগ করতে হয় মুখ লুকিয়ে।

৭। মেসির সমর্থকেরা


২১ বছর বার্সেলোনায় খেলে ক্লাব বদল করেছেন লিওনেল মেসি। রেকর্ডসংখ্যক সাতবার ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসির ক্লাব বদলের কাহিনি সবারই জানা। বাংলাদেশেও মেসির অগণিত ভক্ত। মেসির কারণে তাঁরা ছিলেন স্পেনের বার্সেলোনারও ভক্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বিরাটসংখ্যক বার্সেলোনা সমর্থক এবার মেসির সঙ্গে সঙ্গে ক্লাবও বদলে ফেলেছেন। রাস্তাঘাটে পিএসজির ৩০ নম্বর জার্সি পড়া মেসিভক্ত অসংখ্য। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পিএসজির এই জার্সি। অন্যদিকে বার্সেলোনার নতুন জার্সি পরা কাউকে খুঁজে পাওয়াটাই এখন কঠিন। ফলে বলা যায় এ বছরের আলোচিত দলবদলের মেসি ভক্তরাই।

৮। চিত্রনায়িকা পরীমনি


বছরের সালতামামি লিখতে গেলে পরীমনিকে উপেক্ষা করাই যাবে না। বহুল আলোচিত বোট ক্লাবে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ তুলেছিলেন পরীমনি নিজেই। ঘটনাটি গত জুন মাসের। সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি না হতেই আগস্ট মাসে নিজেই গ্রেপ্তার হন পরীমনি। সেই গ্রেপ্তার অভিযানও ছিল চমকে ভরা। সে সময় করা ফেসবুকে লাইভ দেখেছেন কোটি কোটি মানুষ। পরে এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর ভিডিও ফাঁস ও মামলার তদন্তে যুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার আকস্মিক বাধ্যতামূলক অবসরে যাওয়া নিয়েও কম আলোচনা হয়নি। ঘটনা সেখানেই শেষ ছিল না। বিশেষ করে নিম্ন আদালতে যেভাবে তাঁকে দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে, তাতে শেষ পর্যন্ত হস্তক্ষেপ করতে হয় উচ্চ আদালতকে। এ প্রসঙ্গে হাইকোর্টের বক্তব্য ছিল, ‘চাইলেন আর মঞ্জুর করলেন, এগুলো সভ্য সমাজে হতে পারে না’।আবার জামিন পাওয়ার পরে যেভাবে পরীমনি হাতের মেহেদিতে নানা ধরনের বার্তা দেওয়া চেষ্টা করেছেন, এ নিয়েও চর্চা হবে বহুদিন।

৯। ভবঘুরে ইকবাল হোসেন


শারদীয় দুর্গাপূজার মহা অষ্টমীর দিন ভোরে কুমিল্লা শহরের নানুয়া দিঘির উত্তর পাড়ের এক অস্থায়ী পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন রাখার ঘটনায় মণ্ডপে হামলা চালায় একদল লোক। এরপর মন্দিরে-মণ্ডপে হামলার ঘটনা ঘটে আরও অনেক জায়গায়। সিসি ক্যামেরার সূত্র ধরে কে পবিত্র কোরআন রেখেছে, তা চিহ্নিত হয় এবং কক্সবাজারে অভিযুক্ত ব্যক্তি ধরাও পড়েন। অভিযুক্ত ইকবাল হোসেনের পরিচয় তিনি একজন ভবঘুরে। সব মহল থেকে এই পরিচয়ই দেওয়া হয়। এরপর দুই মাসের বেশি সময় চলে গেছে। এখনো তাঁর পরিচয় ভবঘুরে। এখনো কেউ জানেন না ইকবাল হোসেন কী কারণে বা কার ইশারায় কাজটি করেছিলেন।

১০। গৃহহীনের জন্য ঘর


মুজিব বর্ষ উপলক্ষে লক্ষাধিক গৃহহীন মানুষকে ঘর উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের এ প্রশংসনীয় উদ্যোগটিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় বিদায়ী বছরে। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে দায়িত্বপ্রাপ্ত অনেকের দুর্নীতি, অবহেলা ও অনিয়মের কারণে কার্যক্রমটি নিয়ে সমালোচনা হয়। অনেক ঘরই ধসে পড়ে। অনেক ঘরের মান ছিল খারাপ। ঘর পাইয়ে দিতে দুর্নীতির আশ্রয়ও নেওয়া হয়। ফলে সরকার কিছু পদক্ষেপও গ্রহণ করে। তবে প্রধানমন্ত্রীর নেওয়া একটি বিশেষ প্রকল্প নিয়েও যে ধরনের দুর্নীতি ঘটেছে, অন্য প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে কি সেটিই বিদায়ী বছরে দেশবাসীকে অনুমান করে নিতে হয়েছে।

১১। মুজিবর্ষের বানান ভুল


মুজিব শতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে প্রধানমন্ত্রী যখন শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছিলেন, তখন সবারই চোখ যায় মূল মঞ্চের ডায়াসের দিকে। সেখানে ‘মুজিব বর্ষের’ পরিবর্তে লেখা ছিল ‘মুজিবর্ষের’। তখন থেকেই আলোচনা কোথায় গেল ‘ব’। আয়োজন কমিটির অবশ্য পরে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছে, তবে তার অর্থ বের করতে বেশ কিছুটা সময় লাগবে বলে তা আর এখানে উল্লেখ করা গেল না।


১২। মানবিক বিয়ে


বিদায়ী বছরে দেশবাসী অবশ্য নতুন দুটি শব্দ পেয়েছে। আর তা হলো মানবিক বিয়ে। কথাটা বলেছিলেন হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে অবরুদ্ধ হলে সঙ্গে থাকা নারীকে নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী বলে দাবি করেছিলেন তিনি, যাঁকে গোপনে বিয়ে করেছিলেন। যদিও নিজের প্রকৃত স্ত্রী–ও তা জানতেন না। এরপর তিনি ফেসবুকে এক স্ট্যাটাস দিয়ে গোপন এই বিয়ের ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। আর সেই স্ট্যাটাসের শিরোনামই ছিল, ‘একটি মানবিক বিয়ের গল্প’।


১৩। হেফাজতের তাণ্ডব


ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে ঢাকার বায়তুল মোকাররম ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদ্রাসায় সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে গত ২৬ থেকে ২৮ মার্চ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এ সময় রেলস্টেশনসহ জেলার অর্ধশতাধিক বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। জেলা শহর ও সদর উপজেলার নন্দনপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের কর্মী-সমর্থকদের সংঘর্ষে নিহত হন অন্তত ১৫ জন। এসব ঘটনায় ৫৬ মামলায় ৩৮ হাজারের বেশি আসামি করা হয়। সহিংসতার ঘটনায় হেফাজতের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব সাজেদুর রহমানসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে স্থানীয় সাংসদ উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলা গত ২২ জুন চট্টগ্রামের সাইবার ট্রাইব্যুনাল আদালত খারিজ করে দেন।


১৪। ৭২ ঘণ্টার বেশি হলে ধর্ষণের মামলা নয়


বহুল আলোচিত রাজধানীর বনানীর রেইনট্রি হোটেলে শিক্ষার্থী ধর্ষণের ঘটনায় দায়ের করা মামলার রায়ে মামলার প্রধান অভিযুক্ত সাফাত আহমেদসহ ৫ জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৭ এর বিচারক বেগম কামরুন্নাহারের আদালত ১১ নভেম্বর, এ রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের এক পর্যবেক্ষণে বিচারক বেগম কামরুন্নাহার পুলিশের জন্য বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ধর্ষণের পর ৭২ ঘণ্টার বেশি সময় অতিক্রান্ত হয়ে পুলিশ যেন মামলা না নেয়। আলোচ্য মামলাটি একটি অহেতুক মামলা। এই অহেতুক মামলায় রাষ্ট্রের অনেক সময় অপচয় হয়েছে।


১৫। ড. অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়


প্রায় ছয় বছর পর বহুল আলোচিত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা প্রকৌশলী ড. অভিজিৎ হত্যা মামলার রায় ঘোষণা হলো। রায়ে পাঁচ জঙ্গীর ফাঁসি ও এক জঙ্গীর যাবজ্জীবনের আদেশ দিয়েছে আদালত। একই সঙ্গে সাজাপ্রাপ্তদের প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। আসামিদের মধ্যে বহুল আলোচিত লেখক, প্রকাশক ও ব্লগার হত্যার মাস্টারমাইন্ড সেনাবাহিনী থেকে চাকুরীচ্যুত মেজর জিয়াউল হকসহ দুইজন পলাতক রয়েছে। বাকি চারজন কারাগারে।


১৬। বাদী থেকে প্রধান আসামি বাবুল আক্তার


বাদী থেকে আসামি বাবুল আক্তার। সাবেক এই পুলিশ কর্মকর্তাকে স্ত্রী হত্যার মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে চট্টগ্রামের আদালতে তোলেন তারই এক সময়ের সহকর্মীরা। এর মধ্য দিয়ে পাঁচ বছর আগের মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ডের তদন্ত উল্টো দিকে মোড় নেয়। স্ত্রী মাহমুদা খানম মিতু হত্যার ঘটনায় সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা পেয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলাটি তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রায় পাঁচ বছরের মাথায় বাদী বাবুল আক্তারই হচ্ছেন ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত।


১৭। রোজিনা ইসলামকে আটক


স্বাধীন মতপ্রকাশে বাধা বাংলাদেশের জন্য নতুন কিছু নয়। তবে বিদায়ী সালে সাম্প্রতিক অতীতের অনেক কিছুই ছাড়িয়ে গেছে অনুসন্ধানী সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে আটক, মামলা ও জেলে নেওয়ার ঘটনায়। ১৭ মে সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে ৫ ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করা হয় তাঁকে। কেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে? কারণ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়ম ও দুর্নীতি নিয়ে একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখেছিলেন রোজিনা ইসলাম। ফলে তাঁর কণ্ঠরোধ দরকার হয়ে পড়েছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের।


১৮। অন্যের হয়ে সাজা খাটা মিনু


উচ্চ আদালতের নির্দেশে তিন বছর পর মুক্তি পেলেন ‘সন্তানদের ভরণ-পোষণের মিথ্যা আশ্বাসে’ অন্যের হয়ে সাজা ভোগ করা মিনু আক্তার। তিন সন্তানের ভরণ-পোষণের আশ্বাস পেয়ে বিধবা ওই নারী ২০১৮ সালের জুন থেকে কারাভোগ করছেন বলে কারা কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হয় চট্টগ্রামের আদালত।


১৯। খাল বা নালায় পড়ে মৃত্যু


২৮ সেপ্টেম্বর ২০২১: চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে নালায় পড়ে মারা যান বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী সেহেরীন মাহবুব সাদিয়া। বছরজুড়ে চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন স্থানে নালায় পড়ে কয়েকটি মৃত্যুর ঘটনা দেশে আলোচনার সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসাবে খ্যাত চট্টগ্রামে গত চারমাসে চারজনের মৃত্যু হয়েছে উন্মুক্ত নালা বা খালে পড়ে।
এর আগে অগাস্ট মাসে জলমগ্ন নালায় পড়ে একজন ব্যবসায়ী নিখোঁজ হন। তার আগে ৩০শে জুন চশমা খালে যাত্রী বোঝাই অটোরিকশা পড়ে দুজন নিহত হন।


২০। আবরার হত্যাকাণ্ডের রায়


বুয়েট শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার ২০ আসামির মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
বুধবার (৮ ডিসেম্বর) দুপুরে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ এর বিচারক আবু জাফর মো. কামরুজ্জামান রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার আগে বিচারক বলেন, ‘সকল আসামীর বিরুদ্ধে সন্দেহাতীতভাবে প্রমানিত যে, মিথ্যা অভিযোগ এনে আবরারকে হত্যা করা হয়েছে। যা বাংলাদেশের সকল বাংলাদেশিকে ব্যাথিত করেছে। তাই এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সকলের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা হলো।’


২০২১: এক বছরে যেসব বিশিষ্টজনকে হারালো বাংলাদেশ


২০২০ সালের মতো ২০২১ সালেও ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়ে জীবনপ্রদীপ নিভে গেছে বাংলাদেশের অনেক বিশিষ্টজনদের। আবার অনেকেই স্বাভাবিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংগীত ও অভিনয়শিল্পীসহ নানা পেশার মানুষ।

  1. হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ টি ইমাম) – প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হোসেন তৌফিক ইমাম (এইচ টি ইমাম) ২০২১ সালের ৪ মার্চ মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে কিডনি জটিলতায় ভুগে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।
  2. ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ – বাংলাদেশের সাবেক উপ-রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী মওদুদ আহমদ ২০২১ সালের ১৬ মার্চ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য থাকাকালীন মৃত্যুবরণ করেন এই আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুস ও কিডনি জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মওদুদ আহমদ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতাদের একজন।
  3. জয়নাল হাজারী – জয়নাল আবেদীন হাজারী ছিলেন একজন রণাঙ্গনের বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৭১ সালে ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের পরামর্শে রাজনগর এলাকায় সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেন। চলতি বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাজধানীর ল্যাব এইড হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন জয়নাল হাজারী। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। জয়নাল হাজারী ১৯৮৪ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফেনী-২ (সদর) আসন থেকে ১৯৮৬, ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে টানা তিনবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার দেড় দশক পর দলীয় পদে ফেরেন জয়নাল হাজারী। ২০১৯ সালে ফেনীর এই নেতাকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির উপদেষ্টা করা হয়।
  4. রফিকুল ইসলাম – একুশে পদকপ্রাপ্ত নজরুল গবেষক বাংলা একাডেমির সভাপতি ও জাতীয় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম চলতি বছরের ৩০ নভেম্বর মারা যান। ফুসফুসের জটিলতায় ভুগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক ঘোষণা করে। ১৯৫২ সালে মহান ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। ২০১২ সালে সরকার তাকে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। এছাড়া একুশে পদক, বাংলা একাডেমি পুরস্কার, নজরুল একাডেমি পুরস্কারসহ নানা সম্মানে ভূষিত হন রফিকুল ইসলাম।
  5. সৈয়দ আবুল মকসুদ – লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ ২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। আবুল মকসুদ গবেষণাধর্মী প্রবন্ধের জন্য সুপরিচিত। তার রচিত বইয়ের সংখ্যা ৪০টিরও বেশি। ‘জার্নাল অব জার্মানি’ তার লেখা ভ্রমণকাহিনী। এছাড়া বাংলা সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ১৯৯৫ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পান তিনি।
  6. হাসান আজিজুল হক – স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদকজয়ী প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক ২০২১ সালের ১৫ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগে ভুগে রাজশাহীর বাসভবনে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। হাসান আজিজুল হক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার পাশাপাশি লেখালেখি করে গেছেন। তিনি একাধারে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, একুশে পদক ও স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন।
  7. হাবীবুল্লাহ সিরাজী – বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী ২০২১ সালের ২৫ মে মারা যান। পাকস্থলীর সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে আর ফেরা হয়নি তার। হাবীবুল্লাহ সিরাজীর জন্ম ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর ফরিদপুর জেলায়। তিনি একাধারে কবিতা, উপন্যাস ও শিশুসাহিত্য রচনা করেছেন। সাহিত্যে অবদানের জন্য একুশে পদক, বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশি-বিদেশি নানা পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। ২০১৮ সালে সরকার তাকে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব দেয়।
  8. এ টি এম শামসুজ্জামান – আবু তাহের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান (এটিএম শামসুজ্জামান) চলতি বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি মারা যান। পরিপাকতন্ত্রের জটিলতা নিয়ে কয়েক মাস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠার পর সূত্রাপুরের নিজ বাসভবনে নেওয়া হলে সেখানে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বরেণ্য অভিনেতা। একজন অভিনেতা, পরিচালক ও লেখক হিসেবে বেশ পরিচিত ছিলেন এটিএম। অভিনয়ের জন্য আজীবন সম্মাননাসহ জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ছয়বার।
  9. সারাহ বেগম কবরী – বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সারাহ বেগম কবরী মারা গেছেন চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল। করোনায় আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর। চট্টগ্রামের মেয়ে কবরীর পারিবারিক নাম মিনা পাল। ১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের ‘সুতরাং’ দিয়ে চলচ্চিত্রে অভিষেক হয় কবরীর। স্বাধীনতা-পরবর্তী ১৯৭৩ সালে ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে তার অভিনয় দর্শকদের স্মৃতিতে এখনো অমলিন। ১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ছবিতে অভিনয় করে ছাড়িয়ে যান আগের সব জনপ্রিয়তাকে। পরের গল্পটা শুধুই এগিয়ে যাওয়ার। ষাট ও সত্তরের দশকের তুমুল জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা কবরী রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
  10. ফকির আলমগীর – প্রখ্যাত সঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর ২০২১ সালের ২৩ জুলাই মারা যান। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। গণসঙ্গীত ও দেশীয় পপ সঙ্গীতে ফকির আলমগীরের ব্যাপক অবদান। তিনি ঋষিজ শিল্পীগোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে একুশে পদকে ভূষিত করে। ১৯৫০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা থানার কালামৃধা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে এক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালে শিল্পী একজন শব্দসৈনিক হিসেবে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন।
  11. মিতা হক – ২০২১ সালের ১১ এপ্রিল মারা যান রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী মিতা হক। প্রথমে করোনা আক্রান্ত হলে তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। সেখানে সুস্থ হয়ে বাসায় ফিরলেও কয়েকদিন পরে হার্ট অ্যাটাক হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তিনি। মিতা হক ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রয়াত অভিনেতা খালেদ খানের স্ত্রী। তার চাচা দেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অগ্রপথিক ও রবীন্দ্র গবেষক ওয়াহিদুল হক।
  12. বুলবুল চৌধুরী – ২৮ আগস্ট মারা যান কথাসাহিত্যিক ও লেখক বুলবুল চৌধুরী। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করে রাজধানীর পুরান ঢাকায় নিজ বাসায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার বয়স হয়েছিল ৭৩ বছর। ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২১ সালে তিনি একুশে পদক লাভ করেন। গাজীপুরের সন্তান বুলবুল চৌধুরী লেখালেখি ছাড়াও সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দৈনিক সমকালসহ কাজ করেছেন বিভিন্ন দৈনিকে।
  13. রাবেয়া খাতুন – চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি একুশে পদক বিজয়ী বাংলাদেশি লেখক রাবেয়া খাতুন মারা যান। বেশ কিছুদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগে বনানীতে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর ঢাকার বিক্রমপুরে মামা বাড়িতে রাবেয়ার জন্ম। কর্মজীবনে রাবেয়া খাতুন রচিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক জনপ্রিয় উপন্যাস ‘মেঘের পর মেঘ’ অবলম্বনে বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম ২০০৪ সালে নির্মাণ করেন চলচ্চিত্র মেঘের পরে মেঘ।
  14. গীতিকার ফজল এ খোদা – বিশিষ্ট কবি, গীতিকার ফজল এ খোদা চলতি বছরের ৪ জুলাই রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। বাংলাদেশ বেতারের সাবেক পরিচালক এই গুণী মানুষটির জন্ম ১৯৪১ সালের ৯ মার্চ, পাবনার বেড়া থানার বনগ্রামে। শিশু কিশোর সংগঠন শাপলা শালুকের প্রতিষ্ঠাতা ফজল-এ-খোদা ‘মিতা ভাই’ নামেও পরিচিত। তার লেখা বহু গান শ্রোতাপ্রিয় হয়েছে। এর মধ্যে-‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ মুক্তিযুদ্ধে সাত কোটি মানুষকে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে। ১৯৭১-এ অসহযোগ অন্দোলন চলাকালে তার লেখা গণসংগীত ‘সংগ্রাম, সংগ্রাম, সংগ্রাম চলবে, দিন রাত অবিরাম’ তৎকালীন টেলিভিশন প্রচার করে। ফজল-এ-খোদার লেখা উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে আরও রয়েছে-‘যে দেশেতে শাপলা শালুক ঝিলের জলে ভাসে’, ‘ভালোবাসার মূল্য কত আমি কিছু জানি না’, ‘কলসি কাঁধে ঘাটে যায় কোন রূপসী’, বাসন্তী রং শাড়ি পরে কোন রমণী চলে যায়’, আমি প্রদীপের মতো রাত জেগে জেগে’, ‘প্রেমের এক নাম জীবন’, ‘ভাবনা আমার আহত পাখির মতো, পথের ধুলোয় লুটোবে’ প্রভৃতি। মূলত ছড়া দিয়ে তার লেখালেখি শুরু। তার ছড়াগ্রন্থের সংখ্যা ১০টি আর কবিতা গ্রন্থ ৫টি।

———————————————–
ছবি ও তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট ও বাংলাদেশের পত্রপত্রিকা (প্রথম আলো, ইত্তেফাক, সমকাল, বিডি নিউজ ২৪)

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।