১৯৭০ সালের ভোলা ঘূর্ণিঝড়

“Disaster; East Pakistan: Cyclone May Be The Worst Catastrophe of Century”
The New York Times, November 22, 1970, p. 169

১৯৭০ সালের ১২-১৩ নভেম্বর বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি প্রাণ ও সম্পদ বিনষ্টকারী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছাস। এতে ভোলার লক্ষাধিকসহ উপকূলী্য এলাকার প্রায় ৫ লাখ মানুষের প্রাণহানি হয়। বিশ্ব ইতিহাসে এটি Bhola Cyclone নামে পরিচিত।

এই শক্তিশালী ক্রান্তীয় ঘুর্ণিঝড়টি ৮ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট হয়ে ক্রমশ শক্তিশালী হতে হতে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে থাকে। প্রথম দিকে এই ঘুর্ণিঝড়টির কোনো তথ্য বা সতর্ক সংকেত কর্তৃপক্ষ দিতে পারেনি। সেই সময় পাকিস্তান সরকারের কাছে আধুনিক কোনো প্রযুক্তি ছিল না। বিশেষ করে ঝড়-সাইক্লোন-প্লাবন ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা, তাই পাকিস্তানের পশ্চিমা শাসকেদের এব্যাপারে তেমন একটা মাথাব্যাথা ছিল না। ভারতের সাথে পাকিস্তানের চিরবৈরিতার কারণে ভারতও ঘুর্ণিঝড় সম্পরকে কোনো তথ্য পাকিস্তানকে জানাত না। তাছাড়া শিক্ষা ও জ্ঞানের অভাবে উপকূল এলাকার বেশিভাগ মানুষ এসব ব্যাপারে সচেতন ছিল না। যা-ই হোক, ঘুর্ণিঝড়টি যখন শক্তিশালী হয়ে উপকূলের কাছে চলে আসে অর্থাৎ আঘাত হানার একদিন আগে সরকারের পক্ষ থেকে মহাবিপদ সংকেতের প্রচারণা শুরু করে। উল্লেখ্য, মাস খানেক আগেও এধরনের কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় সম্পর্কে স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর জনসাধারণকে সতর্ক করেছিল। কিন্তু সেগুলো পরে দূর্বল হয়ে দিক পরিবর্তন করাতে তেমন একটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তাই জনসাধারণ এবারের মহাবিপদ সংকেতকে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়নি। সমুদ্রে ভরাজোয়ারের সময় ঘূর্ণিঝড়টি সংঘটিত হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছিল প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছাসের। সর্বোপরি পাকিস্তানের সামরিক সরকার এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের পরও জরুরি ত্রানকর্যের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। এমনকি এই মহাদুর্যোগের খবরটিও তাৎক্ষণিকভাবে দেশে-বিদেশে প্রচার হয়নি। তিনদিন পর তৎকালীন পূর্বদেশ পত্রিকায় ছবিসহ সংবাদ প্রকাশ হয়, শিরোনাম ছিল “ভোলার মানুষ কাঁদে, গাছে গাছে ঝুলছে লাশ”। এইসব ভুলত্রুটি, অবহেলা ও গাফেলাতির কারণে স্মরণকালের সর্বাপেক্ষা বেশি জীবন, সম্পদ, গবাদিপশু ও ফসলের ধংস সাধন হয় এই দুর্যোগে।

এটি বিজ্ঞানের ভাষায় ‘ক্যাটাগরি ৩’ মাত্রার শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল। বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছিল ২২৫ কিমি এবং জলোচ্ছাসের সর্বোচ্চ উচ্চতা ছিল প্রায় ১১ মিটার। ঘূর্ণিঝড়ের পরও যারা বেঁচে ছিল তারা মারা যায় খাদ্য ও পানির অভাবে। সরকারি হিসাব মোতাবেক ৫,০০,০০০ মানুষের মৃতয়ু হয় এবং ৩৮,০০০ সমুদ্রনির্ভর মৎস্যজীবী ও ৭৭,০০০ অভ্যন্তরীণ মৎস্যজীবী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ২০,০০০ এর অধিক মাছ ধরার নৈকা ধংস হয়, ১০ লক্ষেরও অধিক গবাদিপশুর মৃত্যু হয়; ৪,০০,০০০ ঘরবাড়ি এবং ৩,৫০০ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভয়ানকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাছাড়া ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ছিল বিশাল।

সূত্র: বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া, ইন্টারনেট

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।