মাচু পিচু : ইনকাদের হারানো শহর

ইনকা সভ্যতা হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাসে হারিয়ে যাওয়া সমৃদ্ধ সভ্যতার মধ্যে অন্যতম একটি। মাচু পিচু হচ্ছে কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কারের (১৪৯৪ সাল) আগের সময়কার ইনকা সভ্যতার একটি শহর, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে যার উচ্চতা ২৪০০ মিটার (৭,৮৭৫ ফিট)। এটি পেরুর উরুবাম্বা উপত্যকার (Valle de Urubamba) ওপরে একটি পর্বতচূড়ায় অবস্থিত। এটি দক্ষিণ আমেরিকার একটি অন্যতম প্রধান প্রত্নতাত্ত্বিক কেন্দ্র এবং পেরুর সবচাইতে আকর্ষণীয় দর্শনীয় স্থান।
Machu_Picchu
ইনকা সভ্যতার স্বর্ণযুগে ১৪৫০ সালের দিকে মাচু পিচু নির্মিত হয়। কিন্তু তার ১০০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে এটি পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে। সম্ভবতঃ স্পেনীয় অভিযাত্রীদের আগমনের আগেই এই শহরের অধিকাংশ অধিবাসী গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। মাচু পিচুর সন্ধানকারী হাইরাম বিঙাম এবং আরও অনেকেরই মতে এই সুরক্ষিত শহরটি ইনকাদের ঐতিহ্যগত জন্মস্থান অথবা সূর্য কুমারীদের পবিত্র কেন্দ্র ছিল। মাচু পিচু সম্পর্কে বিভিন্ন মতবাদ চালু থাকলেও বেশিরভাগ পুরাতত্ত্ববিদই সমর্থন করেন যে , এটি ইনকা সম্রাট পাচাকুতিকের (কেচুয়া: Pachakutiq পাচাকুতিক্ব্‌) একটি অবকাশযাপন কেন্দ্র এবং এই স্থানটিকে শহর নির্মানের জন্য বেছে নেয়া হয়েছিল এর পবিত্র ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য।

Machu_Picchu_Location
এই দুর্গনগরীটি ইনকাদের রাজধানী কোস্কো (Qusqu) থেকে মাত্র ৮০ কিলোমিটার (৫০ মাইল) দূরে অবস্থিত। কিন্তু এর অবস্থান অজ্ঞাত থাকার কারণে অন্যান্য ইনকা নগরীর মত এই শহরটি কখনও স্পেনীয়দের দ্বারা আক্রান্ত এবং লুট হয় নি। কয়েক শ বছর জনমানবহীন থাকার ফলে শহরটি এক সময় ঘন জঙ্গলে ঢেকে যায় এবং তখন খুব কম লোকই এর অস্তিত্ব সম্বেন্ধে জানত। পরবর্তীকালে ১৯১১ সালের ২৪শে জুলাই মার্কিন ঐতিহাসিক ও ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রভাষক হাইরাম বিঙাম শহরটিকে বিশ্বের নজরে নিয়ে আসেন।

১৯১৩ সালে জাতীয় ভৌগোলিক সংস্থা তথা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি (ইংরেজি: National Geographic Society) তাদের এপ্রিল মাসের পুরো সংখ্যাটি মাচু পিচুর ওপর প্রকাশ করলে শহরটি ব্যাপক প্রচারণা পায়। মাচু পিচুর আশপাশের ৩২৫.৯২ বর্গ কিলোমিটার এলাকাকে ১৯৮১ সালে পেরুর “সংরক্ষিত ঐতিহাসিক এলাকা” হিসেবে ঘোষণা করা হয়। শহরের ধ্বংসাবশেষ ছাড়াও এই এলাকায় অন্তর্ভুক্ত অঞ্চল উদ্ভিদ ও জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ। মাচু পিচুকে ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণায় মাচু পিচুকে বর্ণনা করা হয়েছে ধ্রুপদী বাস্তুকলার নিদর্শন ও ইনকা সভ্যতার অনন্য স্বাক্ষর হিসেবে।

মাচু পিচুর এক পাশ চূড়া থেকে একেবারে খাড়া ভাবে ৬০০ মিটার নিচে উরুবাম্বা নদীর (স্পেনীয়: Río Urubamba) পাদদেশে গিয়ে মিশেছে। গিরিখাত ও পাহাড়পর্বতের দ্বারা প্রাপ্ত চমৎকার প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কারণে এই শহরের অবস্থান সামরিক কৌশলগত দিক থেকে গোপনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। উরুবাম্বা নদীর ওপর দড়ির তৈরি সেতু ইনকা সৈন্যদের গোপন প্রবেশদ্বার হিসেবে ব্যবহৃত হত। মাচু পিচুর পশ্চিম দিকে গাছের গুড়ি নির্মিত আরেকটি সেতু ছিল। এই সেতুর মাঝে ৬ মিটার (২০ ফুট) জায়গা ফাঁকা ছিল, প্রয়োজনমত গাছের তক্তা দিয়ে সেতুর দুই অংশকে সংযুক্ত করা যেত। সেতুটির নিচে ৫৭০ মিটার (১৯০০ ফুট) গভীর গিরিখাত, তাই গাছের তক্তা সরিয়ে দিলে কোনও শত্রুর পক্ষে তা অতিক্রম করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হত। এই সেতুটি নির্মিত হয়েছিল উরুবাম্বা উপত্যকার ওপর।

শহরটি দুই পাহাড়ের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এখান থেকে নিচের উপত্যকা পরিস্কারভাবে দৃশ্যমান, যা সামরিক দিক সুবিধাজনক অবস্থান। এছাড়া শহরের পেছনের খাড়া পর্বত প্রায় অনতিক্রম্য। মাচু পিচুর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পাহাড়ি ঝরনার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, যা সহজে বন্ধ করা যেত না। এছাড়াও যে পরিমাণ চাষযোগ্য জমি ছিল তাতে উৎপন্ন ফসলে শহরের মোট জনসংখ্যার চারগুণ মানুষের খাদ্যের সংস্থান সম্ভব ছিল। পর্বতের পাশগুলো ধাপকেটে সমান করা হয়েছিল। এতে একদিকে যেমন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছিল, অন্যদিকে খাড়া ঢাল বেয়ে শহরে আসার পথটি আক্রমণকারীদের জন্য দুর্গম করা হয়েছিল। মাচু পিচু থেকে পাহাড়ের ওপর দিয়ে কোস্কো যাবার দুটি পথ আছে, একটি “সূর্য দরজা” দিয়ে, এবং অন্যটি “ইনকা সেতু” দিয়ে। শত্রুর আক্রমণের মুখে দুটি পথই সহজে বন্ধ করে দেয়া যেত। এই শহরের মূল উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, এর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল খুবই মজবুত।

Machupicchu_intihuatana

সূর্য মন্দির

মাচু পিচুর বেশির ভাগ স্থাপনাই ইনকা বাস্তুকলার ঐতিহ্যবাহী নির্মাণ পদ্ধতিতে তৈরি। স্থাপনাগুলোর দেয়াল পাথর নির্মিত এবং জোড়া দেবার জন্য কোনওরকম সিমেন্ট জাতীয় পদার্থ বা চুন-সুরকির মিশ্রন এখানে ব্যবহার করা হয় নি। অ্যাশলার (ইংরেজি: ashlar অ্যাশ্‌লার্‌) নামক এই নিমার্ণ কৌশলে ইনকারা খুবই দক্ষ ছিল। এই পদ্ধতিতে পাথরের খণ্ড এমন নিখুঁত ভাবে কাটা হত যেন কোনওরকম সংযোগকারী মিশ্রণ ছাড়াই পাথরগুলো খাজে খাজে শক্তভাবে একটার ওপর আরেকটা বসে যায়। শহরটিতে ১৪০ টি স্থাপনার মধ্যে রয়েছে কিছু মন্দির, পবিত্র স্থান, উদ্যান এবং আবাসিক ভবনসমূহ (আবাসিক ভবনগুলো খড়ের ছাউনি দেয়া ছিল)। মাচু পিচুতে রয়েছে ১০০টিরও বেশি সিড়ি যার মধ্যে কিছু কিছু একটি মাত্র গ্রানাইট পাথরের খণ্ড কুদে তৈরি করা হয়েছে। এখানে আরও রয়েছে প্রচুর সংখ্যক ঝরনা, যেগুলো পাথর কেটে তৈরি করা ছোট ছোট খালের মাধ্যমে পরস্পর সংযুক্ত এবং এসব মূলতঃ সেচ কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়েছিল। প্রমাণ পাওয়া গেছে যে, এই সেচ ব্যবস্থা ব্যবহার করে একটি পবিত্র ঝরনা থেকে পানি প্রতিটি বাড়িতে সঞ্চালনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, মাচু পিচুর শহর ব্যবস্থা তিনটি বড় বিভাগে বিভক্ত ছিল, এগুলো হল: পবিত্র এলাকা, জনসাধারণের এলাকা এবং পুরোহিত ও অভিজাত শ্রেনীর এলাকা।
পবিত্র এলাকায় মাচু পিচুর প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদগুলো অবস্থিত, যেমন: ইন্তিউয়াতানা পাথর, সূর্য মন্দির এবং তিন জানালা ঘর। এসব স্থাপনা উৎসর্গ করা হয়েছিল ইন্তি, তাদের সূর্য দেবতা এবং মহান দেবতার প্রতি। জনসাধারণের এলাকার সাধারণ নিম্ন শ্রেনীর লোকজন বাসবাস করত। এই এলাকার স্থাপনা গুলোর মধ্যে রয়েছে গুদামঘর এবং বসত বাড়ি।

তথ্যসূত্র: ইন্টারনেট ও উইকিপিডিয়া

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।